আরবি ১২ মাসের নাম। নামের অর্থ গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে জানুন
২০২৬ সালের সেরা বাংলা ক্যালেন্ডার | ছুটি, উৎসব ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখআরবি ১২ মাসের নাম ও তাদের ব্যাখ্যা ইসলামি জীবনব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আরবি মাসগুলো মূলত হিজরি সন বা ইসলামি বর্ষপঞ্জির ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যা চাঁদের গতির ওপর নির্ভরশীল। এই ক্যালেন্ডার মুসলমানদের ধর্মীয় ইবাদত, রোজা, হজ, যাকাত, ঈদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল পালনের সময় নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। কুরআন ও হাদিসে আরবি মাসগুলোর বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই আরবি ১২ মাসের নাম ও তাদের অর্থ জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যেমন জরুরি, তেমনি সাধারণ জ্ঞান হিসেবেও এটি অত্যন্ত মূল্যবান।

হিজরি বর্ষপঞ্জিতে মোট ১২টি মাস রয়েছে এবং প্রতিটি মাসের শুরু ও শেষ নির্ধারিত হয় নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে। এই মাসগুলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের মতো নির্দিষ্ট তারিখে শুরু হয় না, বরং প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন এগিয়ে আসে। ফলে রমজান, হজ কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় ইবাদত বিভিন্ন ঋতুতে পালিত হয়। এই বৈচিত্র্য ইসলামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
পেজ সূচিপত্রঃ
আরবি ১২ মাসের নাম ও তাদের অর্থের গুরুত্ব
আরবি ১২ মাস মুসলিম উম্মাহর জীবন ও ইবাদতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। হিজরি বর্ষপঞ্জিতে মোট ১২টি মাস রয়েছে, যেগুলো চাঁদের গতির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিটি মাসের নিজস্ব নাম, অর্থ এবং গুরুত্ব আছে। প্রথম মাস মুহাররম নিষিদ্ধ বা সম্মানিত মাস, যেটি আত্মশুদ্ধি ও তওবার শিক্ষা দেয়। সফর খালি বা শূন্য, যা কুসংস্কার দূর করে সচেতনতা শেখায়। রবি’উল আউয়াল ও রবি’উস সানি বসন্তকাল নির্দেশ করে এবং নবীজি (সা.)-এর জীবন ও সুন্নাহ অনুসরণের মাস। জমাদিউল আউয়াল ও জমাদিউস সানি শুষ্কতা নির্দেশ করে, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা শেখায়। রজব ও শাবান ইবাদত, আত্মসংযম এবং রমজানের প্রস্তুতির মাস। রমজান রোজা ও কোরআন নাজিলের মাস। শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ ঈদ, কুরবানি ও হজের মাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে প্রতিটি মাস মুসলিমদের জন্য নৈতিক শিক্ষা ও ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
প্রথম মাস হলো মুহাররম
মুহাররম হলো আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং চারটি হারাম মাসের মধ্যে অন্যতম। “মুহাররম” শব্দের অর্থ হলো নিষিদ্ধ বা সম্মানিত, যা এই মাসকে বিশেষ মর্যাদা দেয়। ইসলামিক ইতিহাসে মুহাররম মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং খারাপ কার্যকলাপের জন্য নিষিদ্ধ মাস হিসেবে পরিচিত। মুসলমানরা এই মাসে আল্লাহর ইবাদত ও তওবা করতে উৎসাহিত হয়। মুহাররম মাসের দশম দিনকে আশুরা বলা হয়, যা ইসলামী ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আশুরার দিনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) রোজা রাখতেন, যা পূর্ববর্তী বছরের গুনাহ মাফের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। এই মাসে মুসলমানরা বেশি বেশি নফল রোজা, দোয়া, দান-সদকা এবং কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জনের সুযোগ পান। মুহাররম মাস মানুষের ধৈর্য, সংযম এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত।
দ্বিতীয় মাস হলো সফর
সফর হলো আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস। “সফর” শব্দের অর্থ হলো খালি বা শূন্য, যা প্রাচীন আরব সমাজে এই মাসে মানুষের বাড়ি শূন্য থাকার প্রথার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পূর্ব আরবদের ধারণা অনুযায়ী সফর মাসে কিছু কুসংস্কার ও অশুভ ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু ইসলামের আগমনের পর এই সব ভুল ধারণা দূর করা হয়েছে। ইসলামে সফর মাসকে অন্য মাসের মতোই সাধারন মাস হিসেবে ধরা হয় এবং কোনো ধরনের ভয় বা কুসংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। এই মাসে মুসলমানরা সাধারণ ইবাদত পালন করতে পারেন—নফল নামাজ, দোয়া, জিকির ও দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন সম্ভব। সফর মাস মানুষের জন্য ধৈর্য, সচেতনতা এবং আল্লাহর প্রতি স্থির বিশ্বাস বজায় রাখার শিক্ষা প্রদান করে। এটি বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যা আমল ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ বৃদ্ধি করে।
তৃতীয় মাস রবি’উল আউয়াল
রবি’উল আউয়াল হলো আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস। “রবি” শব্দের অর্থ বসন্ত এবং “আউয়াল” অর্থ প্রথম, অর্থাৎ এটি বসন্তকালের প্রথম অংশকে নির্দেশ করে। এই মাসটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ, কারণ এই মাসেই মানবজাতির পথপ্রদর্শক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন।

একই মাসে তাঁর ওফাতও সংঘটিত হয়, যা মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে গভীর তাৎপর্য বহন করে। রবি’উল আউয়াল মাস মুসলমানদের জন্য নবীজি (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও শিক্ষা স্মরণ করার একটি বিশেষ সময়। এই মাসে নবীজির সিরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদিও এই মাসে কোনো নির্দিষ্ট ফরজ ইবাদত নেই, তবুও নফল ইবাদত, দান-সদকা ও নৈতিক উন্নতির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উত্তম সুযোগ রয়েছে।
চতুর্থ মাস রবি’উস সানি বা রবি’উল আখির
জমাদিউল আউয়াল হলো আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির পঞ্চম মাস। “জমাদ” শব্দের অর্থ জমাট বাঁধা বা শুষ্কতা, আর “আউয়াল” অর্থ প্রথম। প্রাচীন আরবে এই সময়ে শীতের প্রভাবে পানি জমে যেত বা পানির স্বল্পতা দেখা দিত, সেখান থেকেই এই মাসের নামকরণ করা হয়েছে। জমাদিউল আউয়াল মাস মুসলমানদের জন্য ধৈর্য, সহনশীলতা ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার শিক্ষা বহন করে। এই মাসে কোনো নির্দিষ্ট ফরজ ইবাদত নেই, তবে নফল ইবাদত, দোয়া, জিকির এবং দান-সদকা করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। ইতিহাসে এই মাসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা মুসলমানদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার উৎস। জমাদিউল আউয়াল আত্মশুদ্ধি, আমলের ধারাবাহিকতা এবং পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোর প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত।
ষষ্ঠ মাস জমাদিউস সানি বা জমাদিউল আখির
রজব হলো আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস এবং এটি ইসলামের চারটি হারাম মাসের একটি। “রজব” শব্দের অর্থ সম্মান করা বা মর্যাদা দেওয়া, যা এই মাসের বিশেষ গুরুত্বকে নির্দেশ করে। প্রাচীন আরব সমাজে এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল এবং মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জীবনযাপন করত। ইসলামের দৃষ্টিতেও রজব মাস অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, কারণ এই মাস আত্মসংযম, তাওবা ও ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বাড়ানোর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। অনেক আলেমের মতে, রজব মাস থেকেই রমজানের প্রস্তুতি শুরু করা উত্তম। এই মাসে বেশি বেশি নফল নামাজ, রোজা, দোয়া ও জিকির করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। রজব মাস মুসলমানদের পাপ থেকে বিরত থেকে সৎকাজে অগ্রসর হওয়ার এবং আত্মশুদ্ধির পথে নিজেকে প্রস্তুত করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ প্রদান করে।
অষ্টম মাস শাবান
জিলহজ হলো আরবি বা হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বাদশ ও শেষ মাস এবং চারটি হারাম মাসের মধ্যে একটি। “জিলহজ” শব্দের অর্থ হলো হজের মাস, কারণ এই মাসে মুসলমানরা প্রতি বছর হজ পালন করেন। জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ এবং এ সময় কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। এই মাসে হজ পালনকারীরা মক্কায় যাত্রা করে ইব্রাহিম (আ.)-এর অনুসৃত নির্দেশনা অনুযায়ী হজের আচার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। জিলহজ মাসে মুসলমানদের জন্য দোয়া, নামাজ, কোরআন পাঠ এবং দান-সদকার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। ঈদুল আজহা এই মাসের গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। জিলহজ মুসলমানদের জন্য ধৈর্য, আত্মসংযম এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথ অনুসরণের একটি অনন্য সময় হিসেবে বিবেচিত।
আরবি ১২ মাসের নাম ও তাদের অর্থের ফযিলত
আরবি ১২ মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য আলাদা আলাদা ফযিলত ও গুরুত্ব বহন করে। বছরের প্রথম মাস মুহাররম নিষিদ্ধ ও সম্মানিত মাস, যেখানে বিশেষ করে দশম দিন আশুরা রোজা রাখা উত্তম, যা পূর্ববর্তী বছরের পাপ মাফের সুযোগ দেয়। সফর মাস মানুষকে সচেতন ও আল্লাহর ওপর স্থির বিশ্বাস রাখার শিক্ষা দেয়। রবি’উল আউয়াল নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও সুন্নাহ অনুসরণের মাস হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ।

রবি’উস সানি নফল ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির সময় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। জমাদিউল আউয়াল ও আখির ধৈর্য, সহনশীলতা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়ায়। রজব হারাম মাস হিসেবে বিশেষ ফযিলতপূর্ণ, নফল রোজা ও তওবা করার সুযোগ দেয়। শাবান রমজানের প্রস্তুতির মাস, যেখানে নবীজি (সা.) বেশি নফল রোজা রাখতেন। রমজান রোজা ও কোরআন নাজিলের মাস। শাওয়াল ঈদ ও ছয় নফল রোজা, জিলকদ শান্তি ও হজের প্রস্তুতি, এবং জিলহজ কুরবানির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস হিসেবে সুপরিচিত।
পেজের শেষ কথা
আরবি ১২ মাসের নাম ও ব্যাখ্যা শুধু একটি ক্যালেন্ডারগত বিষয় নয়, বরং এটি মুসলমানদের জীবনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। প্রতিটি মাসের আলাদা তাৎপর্য, শিক্ষা ও ফজিলত রয়েছে, যা একজন মুসলমানকে সারাবছর আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে অনুপ্রাণিত করে। আরবি মাসগুলোর গুরুত্ব ও অর্থ বুঝে জীবন পরিচালনা করলে ইহকাল ও পরকালে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।


আরাবি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়
comment url