/

মুলা চাষ পদ্ধতি | মুলা কিভাবে চাষ করবেন | লাভজনক মুলা চাষের সম্পূর্ণ গাইড বাংলাদেশ

আপনি কি মুলা চাষ পদ্ধতি নিয়ে ভাবছেন? কিভাবে মুলা চাষ করবেন বুঝে উঠে পারছেন না? নাকি আপনি শীতকালীন সময় মুলা চাষ করে কিভাবে লক্ষাধিক ইনকাম করা যায় তা নিয়ে ভাবছেন যদি আপনি এ সকল বিষয় নিয়ে ভেবে থাকেন তাহলে আপনার এই আর্টিকেলটি বেষ্ট হতে চলেছে। তাহলে চলুন কথা না বাড়িয়ে মুলা চাষ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক- মুলা চাষ পদ্ধতি বাংলাদেশের সবজি চাষিদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কৃষি কার্যক্রম। মুলা একটি দ্রুত বর্ধনশীল শীতকালীন সবজি হলেও বর্তমানে উন্নত জাত ব্যবহারের মাধ্যমে সারা বছরই সীমিত পরিসরে মুলা চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। 

অল্প সময়ে ফলন পাওয়া যায় বলে কৃষকরা খুব সহজেই মুলা চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মুলা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি সবজি, এতে রয়েছে ভিটামিন সি, আঁশ, পটাশিয়াম ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান যা হজম শক্তি বৃদ্ধি করে এবং শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাই বাজারে মুলার চাহিদা সবসময়ই ভালো থাকে, যা মুলা চাষকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলে।

পেজ সূচিপত্রঃ 

মুলা চাষের জন্য উপযুক্ত জলবায়ু 

মুলা চাষের জন্য উপযুক্ত জলবায়ু ও মাটি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত মুলা শীতল ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে ভালো জন্মায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অক্টোবর থেকে জানুয়ারি মাস মুলা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়। তবে তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মুলার বৃদ্ধি সবচেয়ে ভালো হয়। মুলা চাষের জন্য দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযুক্ত, কারণ এই ধরনের মাটিতে পানি নিষ্কাশন ভালো হয় এবং মুলার শিকড় সহজে বড় হতে পারে। শক্ত বা এঁটেল মাটিতে মুলা চাষ করলে শিকড় বেঁকে যায় এবং ফলন ও গুণগত মান কমে যায়। যেহেতু মুলা শীতকালীন সবজি তাই মুলা চাষ করার আগে উপযুক্ত জলবায়ু নির্বাচন করা প্রয়োজন। 

মুলা চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করণ 

মুলা চাষের জন্য জমি প্রস্তুতির ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জমি ভালোভাবে তৈরি না হলে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যায় না। মুলা চাষের জন্য সব সময় উর্বর জমি বেছে নেওয়া উচিত। মুলা চাষের জন্য যখন জমি নির্বাচন করবেন মাথায় রাখবেন জমি যেন মাঝখানে ধিলা না হয়। কারন যদি জমির মাঝখানে যদি নিচু থাকে তাহলে সেচ প্রদান করতে সমস্যা হয়। ও জমির মাঝখানে পানি বেধে থাকে এতে করে মুলা গাছ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই মুলা চাষের জন্য ভালো জমি নির্বাচন করা জরুরি। 

প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করে নিতে হয় যাতে মাটির গভীরে কোনো বড় ঢেলা না থাকে। সাধারণত ৩ থেকে ৪ বার চাষ ও মই দিলে জমি মুলা চাষের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। জমিতে আগাছা সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করতে হবে, কারণ আগাছা মুলার খাদ্য গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। জমি প্রস্তুতির সময় পর্যাপ্ত পরিমাণ জৈব সার যেমন গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং মুলার গঠন সুন্দর হয়।

মুলা চাষে বীজ নির্বাচন

মুলা চাষে বীজ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাত নির্বাচন করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশে জনপ্রিয় মুলার জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তাসাকি, পুষা হিমানি, পুষা চেতকি, ব্যাংকিম, বারি মুলা-১ ও বারি মুলা-২। বীজ অবশ্যই রোগমুক্ত ও ভালো মানের হতে হবে। সাধারণত প্রতি শতকে ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বপনের আগে বীজ শোধন করলে রোগের আক্রমণ কমে এবং অঙ্কুরোদগম ভালো হয়।

মুলা চাষে বীজ বপনের পদ্ধতি খুবই সহজ। সাধারণত সারি করে বা ছিটিয়ে বীজ বপন করা হয়। সারি পদ্ধতিতে চাষ করলে পরিচর্যা করা সহজ হয় এবং ফলন তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। সারি থেকে সারির দূরত্ব সাধারণত ৩০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার রাখা হয়। বীজ খুব বেশি গভীরে বপন করা উচিত নয়, সাধারণত ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার গভীরতায় বপন করলেই ভালো অঙ্কুরোদগম হয়। বীজ বপনের পর হালকা সেচ দিলে অঙ্কুরোদগম দ্রুত হয়।

মুলা চাষের জন্য সার ব্যবস্থাপনা

মুলা চাষে সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ করলে ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধি পায়। জমি প্রস্তুতির সময় প্রতি শতকে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি গোবর সার ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার সুষমভাবে প্রয়োগ করতে হয়। 

সাধারণত ইউরিয়া দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করা ভালো, প্রথম কিস্তি বীজ বপনের ১০ থেকে ১৫ দিন পর এবং দ্বিতীয় কিস্তি ২৫ থেকে ৩০ দিন পর। সঠিক সার ব্যবস্থাপনার ফলে মুলার আকার বড় হয় এবং স্বাদ ভালো হয়। মুলা চাষের জন্য জৈব সার ব্যাবহার করা ভালো। কারন জৈব সার মাটিকে উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং মুলা গাছ কে শক্তিশালী করেতে সাহায্য করে।

মুলা চাষে সেচ ব্যবস্থাপনা

মুলা চাষে সেচ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুলা গাছের শিকড় মাটির নিচে থাকে বলে মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন। তবে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যেতে পারে। সাধারণত বীজ বপনের পর হালকা সেচ দিতে হয় এবং পরবর্তীতে ৭ থেকে ১০ দিন পরপর সেচ দেওয়া যেতে পারে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো প্রয়োজন। সেচের পাশাপাশি জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

মুলার জমিতে সেচ দেওয়ার আগে আগাছা দমন ও নিড়ানি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আগাছা মুলার খাদ্য ও পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ফলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। সাধারণত বীজ বপনের ১৫ থেকে ২০ দিন পর প্রথম নিড়ানি এবং ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর দ্বিতীয় নিড়ানি দেওয়া হয়। নিড়ানির সময় মাটি হালকা করে কুপিয়ে দিলে মাটিতে বাতাস চলাচল সহজ হয় এবং মুলার বৃদ্ধি ভালো হয়।

মুলা চাষে রোগ প্রতিরোধ 

মুলা চাষে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ একটি সাধারণ সমস্যা। মুলায় সাধারণত লিফ কার্ল, পচন রোগ, এফিড ও কাটুই পোকার আক্রমণ দেখা যায়। এসব রোগ ও পোকা দমনের জন্য নিয়মিত ক্ষেত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। জৈব পদ্ধতিতে দমন করতে নিম তেল বা জৈব কীটনাশক ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে কৃষি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত। তবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করলে মুলার গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। 

ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাত করণ 

মুলা চাষে ফসল সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বীজ বপনের ৩০ থেকে ৫০ দিনের মধ্যেই মুলা সংগ্রহের উপযোগী হয়ে ওঠে, যা জাতের ওপর নির্ভর করে। সময়মতো মুলা সংগ্রহ না করলে শিকড় শক্ত হয়ে যায় এবং স্বাদ কমে যায়। সংগ্রহের সময় মুলা সাবধানে তুলে নিতে হয় যাতে শিকড় ভেঙে না যায়। সংগ্রহের পর পরিষ্কার করে বাজারজাত করলে ভালো দাম পাওয়া যায়।

মুলা চাষের লাভজনক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় যে অল্প খরচে এবং কম সময়ে ভালো আয় করা সম্ভব। এক শতক জমি থেকে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ কেজি মুলা উৎপাদন করা যায়। বাজারে চাহিদা ভালো থাকায় কৃষকরা সহজেই লাভবান হতে পারেন। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে মুলা চাষ বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য একটি টেকসই আয়ের উৎস হতে পারে।

মুলা চাষের সুবিধা

মুলা চাষের সুবিধা বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক। মুলা একটি দ্রুত বর্ধনশীল সবজি হওয়ায় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। সাধারণত বীজ বপনের ৩০ থেকে ৫০ দিনের মধ্যেই মুলা উত্তোলন করা যায়, ফলে একই জমিতে স্বল্প সময়ে একাধিক ফসল চাষ করা সম্ভব হয়। এতে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়।

মুলা চাষের আরেকটি বড় সুবিধা হলো এর কম খরচে উৎপাদন ব্যবস্থা। মুলা চাষে অতিরিক্ত সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না, ফলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অল্প পরিমাণ জমিতেও মুলা চাষ করে ভালো ফলন পাওয়া যায়, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। এছাড়া মুলা প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে, তবে দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটিতে এর ফলন আরও ভালো হয়।

পুষ্টিগুণের দিক থেকেও মুলা অত্যন্ত উপকারী একটি সবজি। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, খাদ্য আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান যা মানবদেহের হজম শক্তি বাড়ায় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। বাজারে সারা বছরই মুলার চাহিদা থাকায় কৃষকরা সহজেই ন্যায্য মূল্য পেয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে মুলা চাষ কৃষকদের জন্য একটি সহজ, লাভজনক ও টেকসই কৃষি কার্যক্রম।

মুলা চাষের অসুবিধা

মুলা চাষের অসুবিধা থাকলেও অনেক কৃষক লাভের আশায় এই ফসল চাষ করে থাকেন। মুলা একটি নরম শিকড়জাতীয় সবজি হওয়ায় এটি মাটির গুণগত মানের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। জমি যদি শক্ত, এঁটেল বা অপরিষ্কৃত হয় তাহলে মুলার শিকড় সঠিকভাবে বাড়তে পারে না, ফলে আকারে ছোট, বাঁকা বা ফাটা মুলা উৎপন্ন হয়। এতে বাজারমূল্য কমে যায় এবং কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।

মুলা চাষের আরেকটি অসুবিধা হলো এটি অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল। অতিরিক্ত গরমে মুলা দ্রুত ফুলে যায় এবং শিকড় শক্ত হয়ে স্বাদ নষ্ট হয়। আবার অতিবৃষ্টি বা জমিতে পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে সঠিক সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে মুলা চাষে সমস্যা দেখা দেয়।

মুলা চাষে রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণও একটি বড় সমস্যা। বিশেষ করে লিফ কার্ল, পচন রোগ, এফিড ও কাটুই পোকার আক্রমণে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এসব রোগ দমনে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে। এছাড়া মুলা খুব দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় সময়মতো সংগ্রহ না করলে শিকড় শক্ত ও ফাঁপা হয়ে যায়, যা বাজারজাতকরণে সমস্যা সৃষ্টি করে। এসব কারণেই মুলা চাষে কিছু ঝুঁকি ও অসুবিধা বিদ্যমান।

পেজের শেষ কথা 

মুলা চাষ পদ্ধতি সঠিকভাবে অনুসরণ করলে অল্প সময়ে অধিক ফলন পাওয়া সম্ভব। উন্নত জাত নির্বাচন, সঠিক জমি প্রস্তুতি, সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে যে কেউ সফলভাবে মুলা চাষ করতে পারেন। মুলা চাষ শুধু পুষ্টিকর সবজি উৎপাদনই নয়, বরং কৃষকের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাহলে আমরা জানতে পারলাম যে কিভাবে মুলা চাষ করে সফল হওয়া সম্ভব।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আরাবি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪